ফেব্রুয়ারিতেই নাসার নতুন চন্দ্র মিশন, যাচ্ছে মানুষও?
দীর্ঘ অর্ধশতাব্দী পর আবারও মানুষকে চাঁদের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা। ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টারে শনিবার এক আবেগঘন ও ঐতিহাসিক মুহূর্তে নাসা তাদের বিশালাকার নতুন চন্দ্র রকেটকে উৎক্ষেপণ প্যাডের দিকে নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
আর্টেমিস-২ মিশনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এতে কয়েক দশকের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটাতে চলেছে বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশাল এই রকেটের মাধ্যমে চারজন মহাকাশচারী চাঁদের চারপাশ দিয়ে প্রদক্ষিণ করে ফিরে আসবেন। এটি হবে গত পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে প্রথম কোনো চন্দ্রাভিযান।
শনিবার ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথেই কেনেডি স্পেস সেন্টারের ভেহিকল অ্যাসেম্বলি বিল্ডিং থেকে ৩২২ ফুট ( ৯৮ মিটার) লম্বা এই রকেটটির ধীরগতির যাত্রা শুরু হয়। প্রতি ঘণ্টায় মাত্র এক মাইল গতিতে অগ্রসর হওয়া এই যানটির চার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে প্যাডে পৌঁছাতে প্রায় পুরো দিন লেগে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রকেটটির এই দীর্ঘ প্রতীক্ষিত যাত্রা প্রত্যক্ষ করতে ভোরের কনকনে শীত উপেক্ষা করে সেখানে সমবেত হয়েছিলেন হাজার হাজার নাসা কর্মী ও তাদের পরিবারের সদস্যরা। জনাকীর্ণ সেই পরিবেশে উল্লাস আর উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে নতুন ইতিহাস গড়ার সূচনা হয়। সমবেত জনতাকে নেতৃত্ব দেন নাসার নতুন প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যান এবং এই ঐতিহাসিক মিশনের জন্য মনোনীত চার মহাকাশচারী।
পুরো যানটির ওজন প্রায় ৫০ লাখ কিলোগ্রাম। স্পেস লঞ্চ সিস্টেম (এসএলএস) রকেট এবং এর মাথায় থাকা ওরিয়ন ক্রু ক্যাপসুলটি একটি বিশাল ট্রান্সপোর্টারের ওপর চড়িয়ে নেওয়া হচ্ছে।
উল্লেখ্য, এই একই ট্রান্সপোর্টার অ্যাপোলো এবং শাটল যুগেও ব্যবহৃত হয়েছিল, তবে এসএলএস রকেটের অতিরিক্ত ওজন বহনের জন্য এটিকে বিশেষভাবে সংস্কার করা হয়েছে। ২০২২ সালের নভেম্বরে প্রথমবার এসএলএস রকেটটি পরীক্ষামূলকভাবে মহাকাশে পাঠানো হয়েছিল, তবে সেবার কোনো মানুষ ছিল না। এবার ওরিয়ন ক্যাপসুলে মানুষ থাকবে বলেই এই মিশন নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে বাড়তি উত্তেজনা কাজ করছে।
নাসার কর্মকর্তা জন হানিকাট অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, এবার রকেটে মানুষকে বসিয়ে চাঁদে পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে, যা আগের বারের চেয়ে অনেক বেশি ভিন্ন ও রোমাঞ্চকর অনুভূতি।
তবে এই যাত্রাটি সহজ ছিল না। এর আগে প্রথম পরীক্ষামূলক ফ্লাইটের সময় ওরিয়ন ক্যাপসুলের হিট শিল্ড বা তাপ সুরক্ষা বর্মে কিছু ক্ষতি ও অন্যান্য কারিগরি সমস্যা দেখা দিয়েছিল। সেসব সমস্যা সমাধানে বিজ্ঞানীদের দীর্ঘ বিশ্লেষণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হয়েছে। যার কারণে এই মিশনটি কয়েক বছর পিছিয়ে গেছে।
এবারের ১০ দিনের মিশনে মহাকাশচারীরা চাঁদে অবতরণ করবেন না এবং এর কক্ষপথেও অবস্থান করবেন না। তারা চাঁদকে একবার চক্কর দিয়ে সরাসরি পৃথিবীতে ফিরে আসবেন। চাঁদে মানুষের চূড়ান্ত অবতরণ বা বড় ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে এর পরবর্তী ধাপ বা আর্টেমিস-৩ মিশনের মাধ্যমে, যা আরও কয়েক বছর পর হওয়ার কথা রয়েছে।
এই অভিযানে নেতৃত্ব দিচ্ছেন কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান, পাইলট ভিক্টর গ্লোভার এবং ক্রিস্টিনা কচ। যাদের সবারই আগে মহাকাশে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাদের সাথে যোগ দিচ্ছেন কানাডিয়ান মহাকাশচারী জেরেমি হ্যানসেন, তিনি একজন সাবেক ফাইটার পাইলট হিসেবে এবারই প্রথম রকেট যাত্রার রোমাঞ্চ নিতে যাচ্ছেন।
১৯৭২ সালে অ্যাপোলো-১৭ মিশনের পর এই প্রথম কোনো মানুষ চাঁদের পথে পাড়ি জমাতে চলেছেন। এর আগে ১৯৬৯ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত মাত্র ১২ জন মহাকাশচারী চাঁদের মাটিতে হাঁটতে সক্ষম হয়েছিলেন।
নাসা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুর দিকে উৎক্ষেপণ প্যাডে রকেটটির জ্বালানি পরীক্ষা করা হবে। সেই পরীক্ষার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করেই চূড়ান্ত উৎক্ষেপণের তারিখ নির্ধারণ করা হবে। যদি সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোয়, তবে ফেব্রুয়ারির প্রথম ভাগেই মহাকাশচারীরা যাত্রা শুরু করতে পারেন।
তবে আবহাওয়া বা প্রযুক্তিগত কারণে দেরি হলে মিশনটি মার্চ মাসে পিছিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। নাসার মহাকাশ কেন্দ্রের কর্মীদের মতে, এই রকেটটি কেবল একটি যন্ত্র নয় বরং এটি পৃথিবীর মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ও সাধনার প্রতীক; যা আবারও মানুষকে চাঁদের পথে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
সূত্র: এপি

Leave a Reply