কাগজেই বাড়ে লক্ষ্যমাত্রা, বাস্তবে বাড়ে না

এক দশক ধরেই নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জোর দেওয়ার কথা বলছে সরকার। ভিন্ন ভিন্ন পরিকল্পনায় লক্ষ্য বাড়ে, কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ে না। তাই বারবার পেছায় লক্ষ্যমাত্রা। ২০২১ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ১০ শতাংশ করার কথা ছিল, যা হয়নি। ২০২৫ সাল পর্যন্ত আরেকটি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। এ ক্ষেত্রে অর্জন এখন পর্যন্ত ৪ দশমিক ৬২ শতাংশ।

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য বলছে, বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৮ হাজার ৬১৬ মেগাওয়াট। এর মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ১ হাজার ৩১৪ মেগাওয়াট। এর পুরোটা অবশ্য জাতীয় গ্রিডে যুক্ত নেই। ৯৩ মেগাওয়াট আছে গ্রিডের বাইরে। মোট সক্ষমতার ৭৮ শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ। বায়ুবিদ্যুৎ প্রায় ৫ শতাংশ। আর পানিবিদ্যুৎ আছে ১৭ শতাংশ।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে মূলত ভরসার কেন্দ্রে আছে সৌরবিদ্যুৎ। লক্ষ্য পূরণে বিনিয়োগ ও জমির স্বল্পতার কথা বলা হয়। যদিও শুধু ছাদ ব্যবহার করেই সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ আছে। লক্ষ্য ঠিক করলেও বাস্তবায়নে তৎপরতা কম দেখা গেছে। তাই ধীরগতিতে এগোচ্ছে সবুজ জ্বালানির বিদ্যুৎ উৎপাদন।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য বলছে, ২০১২-১৩ সালেও নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ২ দশমিক ৫৮ শতাংশ। ওই সময় থেকে প্রতিবছর দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়তে থাকে। আর উল্টো দিকে ২০১৯-২০ অর্থবছর পর্যন্ত কমতে থাকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন। এরপর ২০২১-২২ অর্থবছরে এটি ২ শতাংশ হয়। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়ায় ৪ শতাংশে। গত এক যুগে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বেড়েছে মাত্র ২ দশমিক ১৬ শতাংশ। ২০১০ থেকে ২০২৩ সময়ে বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৩ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৩ দশমিক ৩ শতাংশ বিনিয়োগ হয়েছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে।

জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর ভর করে গত আওয়ামী লীগ সরকার একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করেছে। মহাপরিকল্পনা করে এগিয়েছে বিদ্যুৎ খাত। ওই সরকারের দেড় দশকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বেড়েছে পাঁচ গুণের বেশি। সর্বশেষ ২০১৬ সালের মহাপরিকল্পনা অনুসারে ২০২১ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার ১০ শতাংশ আসার কথা নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে। যদিও ২০২৩ সালে করা নতুন মহাপরিকল্পনায় ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ শতাংশ ও ২০৫০ সালের মধ্যে ৪০ শতাংশ করার কথা বলা হয়েছে। তবে বিভিন্ন নথিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রায় ভিন্নতা আছে।

সরকারের অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বলা হয়, ২০২৫ সালের মধ্যে ১০ শতাংশ করা হবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা। ২০২২ সালে করা বাংলাদেশ জলবায়ু সমৃদ্ধি পরিকল্পনায় ২০৩০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ ও ২০৫০ সালে শতভাগ করার কথা বলা হয়েছে। গত সরকারের এসব পরিকল্পনাকে উচ্চাভিলাষী বলে আখ্যা দিয়েছিলেন বিশেষজ্ঞরা।

তবে অন্তর্বর্তী সরকার এ পরিকল্পনায় পরিবর্তন এনেছে। গত সরকারের অনুমোদিত ৩৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সম্মতিপত্র বাতিল করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এর মধ্যে ৩১টি ছিল বেসরকারি খাতের, যেখানে বিদেশি বিনিয়োগও ছিল। গত বছর নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা করা হয়েছে। এতে ২০৪১ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ হবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন। আর ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ করার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। যদিও এ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে নিয়োজিত ১০৫টি কোম্পানির ওপর জরিপ চালিয়েছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডি। গত ১ ডিসেম্বর প্রকাশিত তাদের গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, চারটি ধাপে ৫৫টি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এর মধ্যে ২২টিতে দর পড়েছে একটি করে। ১৩টি দরপত্রে কোনো দর পড়েনি। সব মিলিয়ে গড়ে প্রতিটি দরপত্রের বিপরীতে দর পড়েছে ১ দশমিক ৪টি। তার মানে দরপত্র প্রতিযোগিতামূলক হয়নি।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান প্রথম আলোকে বলেন, গত সরকারের সময় ক্যাপাসিটি চার্জ দিয়ে জীবাশ্ম জ্বালানির সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। ছোট আকারের নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে তেমন আগ্রহ দেখায়নি সরকার। এখন সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ নির্ধারণে মানদণ্ড ঠিক করে দেওয়া হয়েছে। এতে বাড়তি মুনাফা বা দুর্নীতিরও সুযোগ নেই। এতে বিদ্যুৎ বিভাগের সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা উৎসাহ দেন না। বিনিয়োগকারীরাও পিছিয়ে যান। গত সরকারের সময় যারা বেশি দামে বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি করেছে, সেই ব্যবসায়ীরাও প্রক্রিয়া ব্যাহত করেছেন। পদে পদে নানা বাধা। এর মধ্যেও কম সময়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকাশে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়েছে। এতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার ধীরে ধীরে বাড়বে।

শুরুটা ৬৮ বছর আগে, বাড়েনি গতি

দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের শুরুটা হয় কাপ্তাইয়ের পানিবিদ্যুৎ থেকে। পার্বত্য জেলা রাঙামাটির কাপ্তাইয়ে ১৯৫৭ সালে পানিবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ শুরুর মধ্য দিয়ে দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার শুরু হয়। এই কেন্দ্রের সক্ষমতা বাড়ানো হয় ১৯৮৮ সালে। যদিও ২১০ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতার এ কেন্দ্র থেকে এখন উৎপাদন হয় ১০০ মেগাওয়াটের কম।

১৯৯৬ সালে শুরু হয় সোলার হোম সিস্টেম বসানোর প্রকল্প। যেসব এলাকায় বিদ্যুৎ–সুবিধা পৌঁছায়নি, সেসব এলাকার ঘরে ঘরে সৌরবিদ্যুৎ যন্ত্র বসিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। এ পর্যন্ত প্রায় ৬০ লাখ সোলার হোম সিস্টেম বসানো হয়েছে বলে দাবি করে টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা)। তবে এর মধ্যে দেশে শতভাগ বিদ্যুতায়নের ব্যবস্থা করেছে সরকার। যার ফলে সোলার হোম সিস্টেমের বড় একটি অংশ অব্যবহৃত ও অকেজো হয়ে গেছে। যদিও এর সঠিক হিসাব নেই কোনো সংস্থার কাছে।

বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদন নিয়ে ১৩টি এলাকায় গবেষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে কক্সবাজারে দুটি বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। ফেনীতে ২০০৫ সালে নির্মাণ করা হয় প্রথম বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্র। এটির উৎপাদন সক্ষমতা ১ মেগাওয়াটের চেয়ে কম, যা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে কয়েক বছর আগে। ২০০৮ সালে কক্সবাজারে ১ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। একই এলাকায় ৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতার আরও একটি বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্র গত বছর উৎপাদনে এসেছে। এ ছাড়া সিরাজগঞ্জে ২ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্র করা হয়েছে। তবে দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে পানি ও বায়ুবিদ্যুতের চেয়ে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় সম্ভাবনা দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ভারত বা অন্যান্য দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির একাধিক উৎস আছে। দিনের বেলায় সৌরবিদ্যুৎ এবং সন্ধ্যার পর পানি ও বায়ুবিদ্যুৎ দিয়ে গ্রিডের সমতা বজায় রাখেন তাঁরা। দেশে মূলত সম্ভাবনা আছে সৌরবিদ্যুতের। এ ক্ষেত্রে জমির স্বল্পতা একটা বড় সমস্যা।

কক্সবাজারের সাগরদ্বীপ কুতুবদিয়া উপকূলে ৩৮ কোটি টাকায় নির্মিত বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প অচল পড়ে আছে কয়েক বছর ধরে

কক্সবাজারের সাগরদ্বীপ কুতুবদিয়া উপকূলে ৩৮ কোটি টাকায় নির্মিত বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প অচল পড়ে আছে কয়েক বছর ধরেছবি: প্রথম আলো

সবুজ জ্বালানির মূল ভরসা সৌরবিদ্যুৎ

সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে অন্যতম যন্ত্র হলো সোলার প্যানেল। সূর্য থেকে আলো ও তাপ শোষণ করে বৈদ্যুতিক প্রবাহ উৎপন্ন করে এই প্যানেল। এটি আমদানি করা হয়। দেশেও এখন সীমিত পরিসরে সোলার প্যানেল তৈরি করা হচ্ছে। এটি বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রাকৃতিক উৎস। তাই পরিবেশবান্ধব সবুজ জ্বালানি হিসেবে দুনিয়াজুড়ে এর ব্যবহার বাড়ছে। এ ছাড়া এটি নির্মাণের পর নতুন করে জ্বালানি কেনার খরচ নেই। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ঠেকাতে সৌরবিদ্যুৎ মূল ভরসা হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য বলছে, গত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ১৩৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে চুক্তি করা হয়েছে। এর মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদনের জন্য চুক্তি হয়েছে ২৫টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের, যার সক্ষমতা ১ হাজার ১০৪ মেগাওয়াট। বর্তমানে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে সব মিলিয়ে ১৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে আছে। এদের সক্ষমতা ১ হাজার ৫৯ মেগাওয়াট। এর বাইরে ৩৫৮ মেগাওয়াট সক্ষমতার ১২টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণাধীন।

বেসরকারি খাতে ২ হাজার ৫৯৫ মেগাওয়াট সক্ষমতার আরও ৩১টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রাথমিক অনুমোদন দেওয়া ছিল গত সরকারের সময়। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সম্মতিপত্র দেওয়া হয় দরপত্র ছাড়া, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইনের অধীনে। দায়মুক্তি আইন হিসেবে পরিচিত ওই আইন বাতিল করে দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। এরপর নতুন করে দরপত্র আহ্বান করা হয়। এর মধ্যে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ১২টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের দর প্রস্তাব অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা কমিটি। এগুলো এখন পিডিবির সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির অপেক্ষায় আছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, উচ্চমূল্যের বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করা হয়েছে। দরপত্রের মাধ্যমে যে দর পাওয়া গেছে, এগুলোর দাম আগের চেয়ে গড়ে ২১ শতাংশ কমেছে বলে জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্র।

সুনামগঞ্জের শাল্লায় ‘দুর্গম হাওরে সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প’। প্রকল্প এলাকা থেকে সম্প্রতি তোলা

সুনামগঞ্জের শাল্লায় ‘দুর্গম হাওরে সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প’। প্রকল্প এলাকা থেকে সম্প্রতি তোলাছবি: প্রথম আলো

ছাদে সৌরবিদ্যুৎ সম্ভাবনায় নজর

গত মার্চে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস (আইইইএফএ) বলছে, ২০১২ থেকে ২০২০ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে ৫৬ মেগাওয়াট। বর্তমানে এটি বেড়ে ১৬০ মেগাওয়াট হয়েছে। ছাদ ব্যবহার করে বড় ধরনের সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ আছে দেশে। এটি করা গেলে তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করতে পারে সরকার। বিভিন্ন দেশ এমন নজির দেখিয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের যন্ত্রপাতি আমদানিতে উচ্চ শুল্ক একটি বড় বাধা। এ ছাড়া এ খাতে বিনিয়োগের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বরাদ্দ করা তহবিল পর্যাপ্ত নয়। তবে বিশ্ববাজারে সৌরবিদ্যুৎ যন্ত্রপাতির দাম কমছে। এতে অনেকেই বিনিয়োগে উৎসাহী হবে।

সারা দেশে সরকারি সব স্থাপনার ছাদ ব‍্যবহার করে ২ থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে সরকার। প্রথম ধাপে প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে তিনটি মন্ত্রণালয়ের ছয়টি বিভাগ যুক্ত হয়েছে। এর আওতায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের ছাদ ব্যবহার করা হবে। গত ২১ অক্টোবর তিন মন্ত্রণালয়ের ছয়টি বিভাগের সঙ্গে আলাদা করে সমঝোতা স্মারকে সই করেছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যুৎ বিভাগ। ছয়টি বিভাগ হলো মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিভাগ, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ ও স্বাস্থ্যশিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগ।

ছাদ ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা। ৪৬ হাজার ৮৫৪টি প্রতিষ্ঠানে ১ হাজার ৪৫৪ দশমিক ৬১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। যদিও এতে তেমন অগ্রগতি নেই। দরপত্রের প্রক্রিয়া শেষ করে ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে চুক্তি করার সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছিল।

১ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বাস্তবায়ন করার কথা সবচেয়ে বড় বিতরণ সংস্থা পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি)। এ সংস্থার একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, সারা দেশে আরইবি ও সমিতির নিজস্ব ভবন ব্যবহার করে ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। এর মধ্যে প্রথম ধাপে আটটি প্যাকেজে ডাকা দরপত্রের কাজ শুরু হয়েছে। আরও ছয়টির দরপত্র মূল্যায়ন চলছে। এ ছাড়া আরও সাতটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) অনুমোদন করা হয়েছে। শিগগিরই দরপত্র আহ্বান করা হবে। এর বাইরে সরকারি অন্যান্য ভবনের ছাদ ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দরপত্র প্রক্রিয়াধীন আছে।

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্র বলছে, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলসে কিছু সংশোধন আনা হয়েছে। এতে দরপত্র সংশোধন করতে হয়েছে। তাই ছাদে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কার্যক্রম কিছুটা পিছিয়ে গেছে। আগামী জুন পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়েছে।

ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ চান ব্যবসায়ীরা

শ্রীলঙ্কায় ৭৫ শতাংশ বিদ্যুৎ আসে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে। ভারতে আসে ৪০ শতাংশ। বাংলাদেশ এগোতে পারছে না। এ ছাড়া প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ চার গুণ বেশি।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ১০ বছরের কর অব্যাহতি ঘোষণা করা হয় গত বছরের নভেম্বরে। এ ছাড়া নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ বিভাগের প্রত্যয়নপত্রের ভিত্তিতে আমদানি করা সামগ্রীর ওপর ৫ শতাংশ অগ্রিম ভ্যাট মওকুফ করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এ হিসাবে যেসব কোম্পানির বাণিজ্যিক উৎপাদন ১ জুলাই ২০২৫ থেকে ৩০ জুন ২০৩০ সালের মধ্যে শুরু হবে, তারা এ সুবিধা পাবে। বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর পর পরবর্তী ৫ বছরের পরিবর্তে ১০ বছর ১০০ ভাগ কর অব্যাহতি–সুবিধা পাবে তারা। পরবর্তী তিন বছরে ৫০ শতাংশ ও তার পরের দুই বছরে ২৫ শতাংশ হারে কর দিতে হবে।

বাসা, অফিস, কারখানায় সৌরবিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে। নিয়মিত খরচ কমাতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ঝুঁকছেন অনেকেই। দেশে তাই সৌরবিদ্যুৎ যন্ত্রপাতি তৈরি করছে কেউ কেউ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে এখন সৌরবিদ্যুৎ যন্ত্রপাতির বাজার বছরে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার। ২০৩০ সাল পর্যন্ত এ বাজারের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৪০ শতাংশ। দেশীয় কোম্পানি ৩০ শতাংশ সরবরাহ করলেও বাকিটা আমদানি হচ্ছে। আবার বাজারে নিম্নমানের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি বিক্রি হচ্ছে বলেও অভিযোগ আছে।

ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে না পারা ও চড়া আমদানি শুল্কের কারণে সৌরবিদ্যুতের প্রসার হচ্ছে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এ খাতে ৩৭ থেকে ৫৬ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক-কর দিতে হয়েছে শুরুর দিকে। এরপর কয়েক দফায় এটা কিছুটা কমেছে। এখন ২৮ থেকে ২৯ শতাংশ শুল্ক-কর দিতে হয় বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউবেল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআরইএ)। এ সংগঠনের সদস্যরা বলছেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা পূরণে প্রতিবছর ৩০০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ প্রয়োজন। বিদেশি বিনিয়োগ ছাড়া এটি সম্ভব নয়। ৩১টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিনিয়োগ বাতিল করায় বিদেশিদের আগ্রহ কমে গেছে।

বিএসআরইএ সভাপতি মোস্তফা মাহমুদ প্রথম আলোকে বলেন, কর অব্যাহতি তো পাওয়া যাবে উৎপাদন শুরুর পর। ব্যবসাই তো শুরু করতে দিচ্ছে না সরকার। দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা কাগজে-কলমে, এটি বাস্তবায়নমুখী নয়। সুরক্ষা ছাড়া বিনিয়োগ হবে না। নবায়নযোগ্য জ্বালানিও বাড়বে না; বরং নেতিবাচক হতে পারে। আর বিদ্যুৎকেন্দ্র বাতিল করে দরপত্র করায় খরচ কমেনি। আসলে বিশ্ববাজারে প্যানেলের দাম অনেক কমে গেছে। বরং বাতিল না হলে কোনো কোনো কেন্দ্র উৎপাদনে চলে আসত।

লক্ষ্যমাত্রা পূরণে নীতিসহায়তায় ঘাটতি

গত ২৪ ডিসেম্বর প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে সৌরবিদ্যুৎ খাতে দুর্নীতি ও অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে। এটি প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। তারা বলছে, গত সরকারের সময় ছয়টি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে বাড়তি খরচ হয়েছে ২ হাজার ৯২৬ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। ভূমি ক্রয়, ইজারা ও জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন রকম অনিয়ম পাওয়া গেছে। দাম নির্ধারণে আন্তর্জাতিক কোনো মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়নি। বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি ডলারে করা হয়েছে। এতে ডলারের দাম বাড়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে।

টিআইবির গবেষণা বলছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের প্রস্তাব অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা দেখা গেছে। নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়ন করতে না পারায় দফায় দফায় মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। গড়ে মেয়াদ বেড়েছে ৯০৮ দিন, যার মধ্যে সর্বোচ্চ মেয়াদ বেড়েছে ১ হাজার ৪০২ দিন। এ সরকারের সময়ও প্রতি প্যাকেজের দরপত্রের মেয়াদ বেড়েছে এক থেকে পাঁচবার। এরপরও কয়েকটি প্যাকেজে পুনরায় দরপত্র ডাকতে হবে।

সিপিডি বলছে, যেসব দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকাশ হয়েছে, সেখানে নবায়নযোগ্য খাতে গুরুত্ব দিয়ে আলাদা উদ্যোগ ছিল। আর দেশে জীবাশ্ম জ্বালানি–কাঠামোর মধ্যে নবায়নযোগ্যের পরিকল্পনা এগিয়েছে। জ্বালানি–নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সস্তা জ্বালানি বেছে নিয়েছে। তাই গ্যাসের পর ফার্নেস তেল, কয়লার দিকে গেছে। এর মধ্যেই বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা চাহিদার ৪০ শতাংশ বেশি হয়ে গেছে। তাই উচ্চ ব্যয়ের নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে কেউ আগ্রহ দেখায়নি। এখন নবায়নযোগ্য জ্বালানি খরচ কমে এসেছে। কিন্তু অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতার মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাড়ানো হলে সক্ষমতা আরও বাড়ার ঝুঁকি আছে।

সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, শুধু লক্ষ্যমাত্রা করলেই তা বাস্তবায়ন হয়ে যায় না। কয়েকটি কারণে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত এগোচ্ছে না। লক্ষ্যমাত্রা পূরণে নীতিসহায়তা নিশ্চিত করা হয়নি। জ্বালানি–নিরাপত্তায় সস্তা জ্বালানির দিকে গেছে গত সরকার। আমদানিতে উচ্চ শুল্ক-কর রাখা হয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে সরকারের আলাদা করে উদ্যোগ ছিল না। বর্তমান সরকারের সময় উৎসাহ তৈরি করা হয়েছে। এতে বোঝা যায়, আরও আগেই সম্প্রসারণের সুযোগ ছিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *