ফোক গানের পুনর্জন্ম
সংগীত হচ্ছে একটি গুরুমুখী বিদ্যা। আমাদের নতুন শিল্পীরা কেন জানি গুরুমুখী হতে চায় না। তাঁরা শর্টকাটে জনপ্রিয় হতে চায়। গানচর্চা করার যে দীর্ঘ সাধনা, সেই ধৈর্য তাঁদের মধ্যে কম। এক ধরনের অস্থিরতা তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে তাদের।’ –শফি মণ্ডল
বাংলাদেশের ধূলিকণা আর নদীর কলতানে মিশে আছে যে আদিম সুর, তাকে আমরা বলি ‘ফোক’ বা লোকসংগীত। যা আমাদের চিরচেনা মাটির গান। এ গানগুলো এখন সময়ের বিবর্তনে নতুন রূপে ধরা দিচ্ছে। নতুন করে হচ্ছে ফোক গানের ফিউশান। তাই কথা থেকে যায়, সময়ের আবর্তে এই মাটির গানে কি মরচে ধরেছে, নাকি নতুন কোনো উজ্জ্বলতা নিয়ে হাজির হয়েছে আজকের প্রজন্মের কাছে? আজকের ফোক সুরের এই যে দীর্ঘ পথচলা, সেখানে ফোক গান এখন কোথায় দাঁড়িয়ে? আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের ঝনঝনানি কি তবে গ্রামীণ দোতারার সেই করুণ সুরকে গ্রাস করে নিল, নাকি নতুন রূপে তাকে প্রাণদান করল?
ঐতিহ্যের সেই আদিম ঘ্রাণ
ফোক সংগীতের এই বিশেষত্ব হলো এদের বিবর্তন। লোকমুখে ফিরতে ফিরতে গানগুলো যুগে যুগে পরিবর্তিত হয়, সমৃদ্ধ হয়। বংশপরম্পরায় টিকে থাকা এই সুরগুলো বিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এসে এক বিশাল বাঁক নেয়। বাংলার লোকগান আসলে এই মাটির মানুষের জীবনসংগ্রাম, প্রেম আর আধ্যাত্মিকতার দলিল। আব্বাসউদ্দীন আহমদ কিংবা আবদুল আলীমের সেই দরদি কণ্ঠ যখন আবার শাহ আবদুল করিমের বাউল দর্শন আমাদের শেখায় বৈরাগ্য আর পরমাত্মার সন্ধান। এ গানগুলো কোনোদিন ড্রয়িংরুমের অভিজাত গান ছিল না, এগুলো ছিল প্রান্তিক মানুষের জীবনসঙ্গী। আজ সেই ধারাটিই বিবর্তিত হয়ে আধুনিক স্টুডিওতে ঠাঁই করে নিয়েছে।
সেই গানের জনপ্রিয়তার পারদ কি নামছে?
একসময় এদেশে ফোক সংগীতের আসর বসত রাতভর। আর্মি স্টেডিয়ামে বসত ‘ফোক ফেস্ট’সহ নানা রকম উৎসব। কিছু টিভি স্টেশন ফোক গান নিয়ে রিয়েলিটি শো করলেও সেগুলো অপ্রতুল। তাই এ সময়ের একদল সমালোচক ও সংগীতবোদ্ধা মনে করেন, ফোক গানের সেই সোনালি দিন ফুরিয়ে আসছে। তাঁদের মতে, আজকালকার গানে ‘মাটির সোঁদা গন্ধ’ নেই, আছে যান্ত্রিকতা। তাঁরা অভিযোগ করেন, এখনকার ফোক গান মানুষের হৃদয়ের গভীরে পৌঁছাতে পারছে না। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠ বলছে অন্য কথা। বর্তমান সময়ে ‘ফোক ফিউশন’ বা আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে লোকসুরকে মিলিয়ে দেওয়ার প্রবণতা এক নতুন জোয়ার সৃষ্টি করেছে। তরুণ প্রজন্মের কাছে বাংলা ব্যান্ড, অর্ণব, জলের গান, লালন ব্যান্ড কিংবা একক গানের শিল্পীদের জনপ্রিয়তা প্রমাণ করে যে, শিকড়ের টান আজও অমলিন। বরং তাঁরা লোকগানকে আরও বড় পরিসরে এবং আরও রঙিন মোড়কে নতুন প্রজন্মের সামনে হাজির করেছে। যেমন শাহ আবদুল করীমের ‘কেন পিরিতি বাড়াইলা’ নতুন করে গেয়েছেন হাবিব, ইমরানসহ অনেকেই। ফিউশান হয়েছে। নতুন করে মানুষের সামনে এসেছে তার বেশির ভাগ গান শাহ আবদুল করীমে ‘ভব সাগরের নাইয়া’ গেয়েছেন এই প্রজন্মের কণ্ঠতারকা অনিমেষ রায়। হাজং ফোক গান ‘নাসেক নাসেক’ গেয়েও জনপ্রিয় হয়েছেন অনিমেষ ও পান্থ কানাই। যেসব ফোক গান জনপ্রিয় হয়েছে ফিউশানে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে নামাজ আমার হইলো না এবং তোমার ঘরে (বাংলা ব্যান্ড, আনুশেহ আনাদীল), দেওড়া (প্রীতম), কথা কইয়ো না (শিবলু মৃধা), সব লোকে কয় (কণা, কানিজ মিতু), আমি তো বালা না (কামরুজ্জামান রাব্বী), কানার হাট বাজার ও পাগল মন (ডিজে রাহাত), বেতের আড়া (আনকন), নেশা লাগিল রে (চঞ্চল-শাওন), প্রাণ সখিরে (নাদিয়া ডোরা), বকুল ফুল বকুল ফুল (জলের গান), সর্বত মঙ্গল রাঁধে (চঞ্চল-শাওন), পরের জায়গা পরের জমি (জলের গান), তিন পাগলের হলো মেলা (জলের গান), ভাবের দেশে (অনিমেষ), আমার মন ভালা না (অনিমেষ), বলবো না গো (সুকুমার), অন্যদিকে বেঙ্গল সিম্ফনি (ইমন চৌধুরী), কুঁড়েঘর, নকশীকাঁথাসহ নতুন-পুরাতন অনেক ব্যান্ড ফোক গানের ফিউশান করে সবার মুগ্ধতা কাড়ছে। হাবিব, শিরিন, মিলা, ফুয়াদ, কাজী শুভ, এফ এস সুমন, তোশিবা, কামরুজ্জামান রাব্বী, কায়া, আরফিন রুমী, আরমান আলীফসহ অনেক শিল্পীর কণ্ঠে ফোক গানগুলো মানুষের মুখে মুখে ফিরে।
একতারা থেকে ইলেকট্রিক গিটার
বিবর্তনই জগতের নিয়ম। ফোক গানও তার ব্যতিক্রম নয়। একসময় যা ছিল কেবল একতারা আর দোতারার সুর, আজ তা হয়তো ড্রামস, গিটার আর সিন্থেসাইজারের তালে অনুরণিত হচ্ছে। মোড়ক বদলেছে ঠিকই, কিন্তু গানের আত্মার যে হাহাকার, প্রেমের যে আকুলতা কিংবা স্রষ্টার প্রতি যে আত্মসমর্পণতা আজও অপরিবর্তিত।
গুরুমুখী বিদ্যা ও গতির অস্থিরতা
ফোক গানের প্রখ্যাত শিল্পী শফি মণ্ডল বলেন, ‘সংগীত হচ্ছে একটি গুরুমুখী বিদ্যা। আমাদের নতুন শিল্পীরা কেন জানি গুরুমুখী হতে চায় না। তারা শর্টকাটে জনপ্রিয় হতে চায়। গানচর্চা করার যে দীর্ঘ সাধনা, সেই ধৈর্য তাদের মধ্যে কম। এক ধরনের অস্থিরতা তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে তাদের।’ তার মতে, টিভি চ্যানেল এবং রিয়েলিটি শোগুলো শিল্পীদের দম ফেলার সময় দিচ্ছে না। ফলে একজন শিল্পী নিজেকে চেনার আগেই তারকা হয়ে যাচ্ছেন। সব মিলিয়ে একটি অস্থির পরিবেশ বিরাজ করছে আমাদের এই গানের জগতে। বর্তমানে নতুন প্রজন্মের অনেক শিল্পী বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে ফোক গান পরিবেশন করছেন এবং গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করে ফোক গানকে নতুন মাত্রা দিচ্ছেন। বিবর্তনকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন শিল্পী সায়েরা রেজা। তিনি মনে করেন, ‘বর্তমানে ফোক গানের মান কোনো অংশেই কম নয়। নতুনরা প্রবীণ শিল্পীদের গান অনুকরণ করে নিজের মতো করে গাওয়ার চেষ্টা করে। এতে গানের আবেদন ফুরিয়ে যায় না, বরং নতুন এক ধরনের মাধুর্য তৈরি হয়। এটা ইতিবাচক হিসেবেই দেখি।’
কেন জনপ্রিয় ফোকের নতুন সংস্করণ
আজকের দিনে ফোক গানের পুনর্জাগরণের পেছনে বেশ কিছু প্রযুক্তিগত ও সৃজনশীল কারণ রয়েছে। যেমন এখন আর ফোক গান কেবল গ্রামবাংলার মেলায় বা রেডিওর শিডিউল শোনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ইউটিউব, ফেসবুক, টিকটক আর স্পটিফাইয়ের কল্যাণে এই গান এখন সবার পকেটে। ফলে এই ধারার গান এখন আর শুধু বিশেষ অনুষ্ঠানের বিষয় নয়। অন্যদিকে আধুনিক সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ‘স্লো রিভার্ব’ এবং উন্নত শব্দবিন্যাস গানগুলোতে এক ধরনের মায়াবী ও আধ্যাত্মিক আবহ তৈরি করেছে। এতে গানগুলো শুনতে আরও বেশি আরামদায়ক ও আবেদনময়ী হয়ে উঠেছে।

Leave a Reply